নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃ নেত্রকোনায় বৃষ্টি আর বর্যা এলেই বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের মানুষের মনে বজ্রপাত আতঙ্ক বিরাজ করে। সামান্য ঝড় বৃষ্টিতেই শুরু হয় বজ্রপাত। এ জেলায় গত ৭ মাসে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়ে অন্তত ১৩ জন।
জানা যায়,গত ১৮ জুন বৃষ্টিতে বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪)। একই দিনে কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান শামসুল হুদা (৫৫),সান্দিকোনা এলাকায় প্রাণ হারান আশরাফুল ইসলাম (২৫)। এক দিনে তিনজনের মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পরিবারগুলোতে। পরিবারের জন্য মাছ নিয়ে ফিরবেন এমন আশা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি। হঠাৎ আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষদের হারিয়ে স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকা।
এসব নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। জেলায় এভাবে বৃষ্টি,বর্ষার সময় বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এই অঞ্চলের কৃষকদের প্রতিদিনই হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বাধ্য হয়ে বজ্রপাত আতঙ্ক মাথায় নিয়ে মাঠে নামতে হয় কাজে। জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকারও হচ্ছেন তারা।
জানা যায়,নেত্রকোনা জেলায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে বজ্রপাতের প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। এরমধ্যে ২০২১ সালে বজ্রপাতে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ১২ জন এবং চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক বলেন, ‘হাওরে কাজ করতে গেলে আকাশের অবস্থা সব সময় বোঝা যায় না। অনেক সময় হঠাৎ মেঘ করে বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে কোনো ঘর বা নিরাপদ জায়গা না থাকায় আতঙ্কের মধ্যেই থাকতে হয়।’
এ ছাড়া জেলেদেরও একই অভিজ্ঞতা। মাছ ধরার সময় বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হলে নৌকা নিয়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় তাদের।
নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে এবং বজ্রমেঘ সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর প্রভাব রয়েছে। বজ্রপাত মূলত ‘কিউমুলোনিম্বাস’ বা সিবি মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়। এখন নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে গেছে। তাই হাওর এলাকায় তালগাছসহ উঁচু গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন