গাজীপুর প্রতিনিধিঃ গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার। এই বাজারটি এখন দেশের অন্যতম পাইকারি কাঁঠালের মোকাম হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। কাঁঠালের রাজধানী হিসেবে পরিচিত এখানে মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন সকাল থেকে পর্যন্ত চলে জমজমাট বেচাকেনা। বর্তমানে এখানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এই আড়তে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কৃষকরাও।
গাজীপুর জেলা সদর সহ প্রায় সব উপজেলাতেই প্রচুর পরিমানে কাঁঠালের চাষাবাদ হয়ে থাকে। এ জেলার মাঠ ঘাট থেকে দু’চোখ যেদিকে যায় শুধু কাঁঠাল আর কাঁঠাল গাছ। বাড়ির উঠান, ঘরের বারান্দা সবখানে একই দৃশ্য। এসব গাছে প্রচুর পরিমান কাঁঠাল জন্মে। যা স্থানীয় চাদিহা মিটিয়ে চলে যায় সারা দেশে। বিপুল পরিমান উৎপাদিত এসব কাঁঠাল বিক্রির জন্য এখানে গড়ে উঠেছে ছোট,বড় কাঁঠাল বিক্রির বাজার ও মোকাম। এসব বাজার ও মোকামে ভ্যানে, রিকশায়, অটোরিকশা, টেম্পো, ট্রাক ও রাস্তার মোড়ে ও বাজারে ক্ষুদ্র চাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার, ব্যাপারী ও পাইকারি বিক্রেতাদের স্তূপ করে কাঁঠাল বিক্রি করতে দেখা যায়। খাজা, গালা ও দুরসা এ তিন ধরনের কাঁঠাল হয়ে থাকে এ অঞ্চলে।
কাঁঠালের চাহিদা বেশি হওয়ায় ছোট (মুচি) অবস্থায়ও অনেক বাগান মালিক পাইকারদের কাছে গাছ বিক্রি করে দেন।
শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজারে বসে এই কাঁঠাল বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় হাট (মোকাম)। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ক্রেতারা ছুটে আসেন কম দামে সুস্বাদু কাঁঠাল কিনতে। সেগুলো নিয়ে তারা স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি করেন তারা। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত এই হাটে কাঁঠাল কেনা বেচা হয়। শ্রীপুরের বাগান মালিকরা প্রতিদিন ভোরে বাগান থেকে পাকা কাঁঠাল সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য ভ্যান, ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে আসেন বাজারে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই দেখা যায় মহাসড়কের ওপর ট্রাকের বহর। লাইন ধরে বিভিন্ন আড়তের সামনে থেকে ট্রাকে কাঁঠাল উঠছে।
এই মৌসুমে জৈনাবাজার সরগরম থাকে কাঁঠালের ক্রেতা-বিক্রিতার পদ চারনায়। জ্যৈষ্ঠের শুরুতে এরকম চিত্র চলে আষাঢ় মাসের শেষ পর্যন্ত।
এই কাঁঠালের হাটের শ্রমিক সাইফুল ইসলাম (৩৫), রফিকুল ইসলাম (৩২) জানান, আট বছর যাবত আড়তে কাঁঠাল উঠানামা করছি। এখানে ৪-৫টি শ্রমিকের গ্রুপ রয়েছে। প্রতি গ্রুপে ১১ থেকে ১২ জন সদস্য রয়েছে। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টা ট্রাক-পিকআপ লোড করা যায়। সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আড়তে কাজ করতে হয়। প্রতিটি কাঁঠাল গাড়িতে উঠালে ১.৫০ টাকা পান তারা। ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করে। তারা দৈনিক এক হাজার থেকে ১,৩০০ টাকা হাজিরা পান।
এখানে কাঁঠালের এ মৌসুমি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয় অন্তত কয়েক হাজার শ্রমিকের।
স্থানীয় কাঁঠাল ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, তিনি আড়াই লাখ টাকার কাঁঠাল (তিনটি বাগান) কিনেছেন। ওইসব বাগানে প্রায় দেড় হাজার কাঁঠাল গাছ আছে। কাঁঠাল পাকছে, পেড়ে এনে বাজারে বিক্রি করছি। এ পর্যন্ত খরচ বাদ দিয়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করেছি। আরও ১৫ থেকে ২০ দিন কাঁঠালের ভরা মৌসুম থাকবে। শেষ সময়ের দিকে কাঁঠালের দাম বেড়ে যায়। আশা করছি ২ লাখ ২০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করতে পারব ।
জৈনাবাজারের কাঁঠালের পাইকার আব্দুল আজিজ জানান, বর্তমানে কাঁঠালের দাম কমে যাওয়ায় দৈনিক ৩০ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে। কয়েকদিন আগে দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে দৈনিক এক কোটি টাকারও বেশি কাঁঠাল বিক্রি হয়েছে এ বাজারে। এখান থেকে কাঠাল চলে যাচ্ছে সারা দেশে।
বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি হচ্ছে গাজীপুরের কাঁঠাল। তবে কাঁঠাল সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার নেই। শুধু সংরক্ষণের অভাবে প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকার কাঁঠাল নষ্ট হয়। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও এর একটি বড় অংশ বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কাঁঠাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন অনেক কৃষক।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, বছরে গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে খাজা জাতের কাঁঠাল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে। কাঁঠাল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা নিয়ে কাজ করা হবে।