
কৃষি সময় ডেস্কঃ
খাগড়াছড়ি,রাঙামাটি,বান্দরবান,কক্সবাজাওে পানিবন্দি হয়ে লাখো মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছে কয়েক হাজার মানুষ। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পানির নিচে থাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমির আমন ধান, সবজি ও বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এছাড়া সাত জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ।
কক্সবাজারে পানিবন্দি লাখো মানুষঃ
কক্সবাজারের ১০ উপজেলায় বৃহস্পতিবারও বৃষ্টি অব্যাহত ছিল। রামু ও কক্সবাজার, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদর উপজেলার ৬ ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, মাতামুহুরীর নদীর কোনাখালী পুরুইত্যাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে ঢুকেছে। পৌরসভার ভাঙারমুখ, আমাইন্যারচর, নামার চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালীর পুরুইত্যাখালী, মরংঘোনা এলাকায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, উপজেলার নতুন কিছু ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চকরিয়া উপজেলায় ২০ টন ও মাতামুহুরীতে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম সমকালকে বলেন, দুর্গত মানুষের জন্য নগদ টাকা, চালসহ প্রয়োজনীয় অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান সমকালকে বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা ৩০ লাখ নগদ টাকা, সাড়ে ৪০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্যাকেটজাত শুকনো খাবার জমা রয়েছে।
রাঙামাটিতে চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, চন্দ্রঘোনা-বাঙালহালিয়া সড়কসহ অন্তত ১২৭টি স্থানে ছোট-বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার ৩০টি গ্রাম। এ পর্ষন্ত বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৪ হাজার ২৬৫ জন মানুষ। পানিতে ভেসে গিয়ে দুই ব্যক্তির মুত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে প্রায় আড়াই ঘণ্টা যানবাহন চলা বন্ধ ছিল। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের লোকজন মাটি সরিয়ে ফেলে। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। চন্দ্রঘোনা-বাঙালহালিয়া সড়কের পাহাড় ধসে পড়ায় চলাচল বন্ধ ছিল। বিকেল চারদিকে মাটির সরানোর যানবাহর চলাচল স্বাভাবিক হয়। দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়কের তিন কিলোমিটার পর্যন্ত ফাটল দেখা দেওয়ায় ওই রুটে যানবাহল বন্ধ রয়েছে। রাজস্থলী উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ির অরুণোদয় পয়েন্টের সীমান্ত সড়কে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া রাঙামাটি শহরের এডিসি হিলে, পুরাতন লাইন, নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার-সংলগ্ন পাশের গলি, শিমুলতলী, কাউখালী উপজেলাসহ ১২৮টি ছোট বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে সম্পত্তি ও ঘরবাড়ি ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউই হতাহত হয়নি। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ২৬৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
বান্দরবানে দেড় হাজার মানুষ আশ্রয়শিবিরে
দুর্গতদের জন্য সাত উপজেলা ও দুই পৌরসভায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খিচুড়ি, শুকনা খাবার, মোমবাতি ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হচ্ছে।
কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। নদীর দুই তীরের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বান্দরবান ও লামা পৌরসভার নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানিতে ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে কয়েকশ হেক্টর সবজি ক্ষেত।
উপজেলাগুলোতে গত বুধবার রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল ফোন সংযোগও নেই। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার স্থানীয় ও পৌরসভার কিছু এলাকার বাসিন্দারা।
সড়কে পানি ওঠায় বান্দরবান থেকে রাঙামাটি এবং জেলা শহরের স্টেশন থেকে রুমা ও থানচির উদ্দেশে বৃহস্পতিবার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক সামাল দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণির কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। বিভিন্ন উপজেলার অনেক এলাকা বিদ্যুৎহীন রয়েছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক সড়কের বড়দিঘিপাড় এলাকায় এখনও স্বাভাবিক হয়নি যান চলাচল। দুটি স্থানে কোমরপানির নিচে সড়ক। পানিতে ডুবে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী এলাকা। ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৭১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
খাগড়াছড়ির পানি নামছে ধীরে ধীরে
বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বৃষ্টিবিরতির ফলে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। কিন্তু জেলা শহরের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা রয়েছে। জেলার দীঘিনালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে দীঘিনালাতেই। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়ক এবং দীঘিনালা-লঙগদু সড়কের দীঘিনালা অংশের বেশ কিছু জায়গা এখনও পানির নিচে রয়েছে। এসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের নিম্নাঞ্চল পানির নিচে রয়েছে। চেঙ্গী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে। তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৩৮ হেক্টর আউস ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি ১৪৩ হেক্টর, আমন ধানের বীজতলা ২০২ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মৌলভীবাজারে নদনদীর পানি বাড়ছে
মৌলভীবাজার জেলার সবক’টি নদনদীর পানি বেড়েই চলেছে। তবে মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৮-৩০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতের ধাক্কায় মনু তীরের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর স্থানে বৃহস্পতিবার বিকেলে ভেঙে গেছে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ।
এদিকে দুদিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর সীমান্তবর্তী মখাবিল এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে এবং সড়কের কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। আউশক্ষেত ও শাকসবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জে ৫০ গ্রাম প্লাবিত
টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের নিচু এলাকার অনেক সড়ক ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও বাড়ির আঙিনায় পানি উঠেছে। জেলা শহরের পাশ দিয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। ষোলঘর পয়েন্টে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ৭ দশমিক ২৪ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। মাত্র ৫৬ সেন্টিমিটার পানি বাড়লেই পানি বিপৎসীমায় পৌঁছাবে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা) বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ার খলার ১০০ ফুট ও আনোয়ারপুর সড়কের ৫০ ফুট সড়কে দুই ফুট পানি উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙনে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে উপজেলার পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি উঠেছে। সীমান্ত নদী যাদুকাটা বৌলাই, মাহারাম, রক্তি পাটলাই দিয়ে ঢল নামছে। এসব নদীর পারের নিম্নাঞ্চলের ৫০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
হবিগঞ্জে নদনদীর পানি বৃদ্ধি
হবিগঞ্জের নদনদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। জেলার খোয়াই নদীর চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ৯৯ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের তিন উপজেলায় দুর্ভোগ
কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামে জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। পাউবোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কালনী নদীর পানির লেভেল ২.৪৭ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা প্রাক-বর্ষা বিপৎসীমার (৫.৩৫ মিটার) ২৮৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ইটনা স্টেশনে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৩.১৪ মিটার এবং চামড়াঘাট স্টেশনে ধনু নদীর পানি ২.৭৫ মিটারে অবস্থান করছে।