
ভোলা সংবাদদাতাঃ
ভোলায় সর্জান বা কান্দি পদ্ধতিতে সমন্বিত চাষাবাদে ব্যাপক সফলতা মিলেছে। এই পদ্ধতির চাষাবাদে কৃষকরা বছরজুড়ে ফসল এবং নানা ধরনের সবজি চাষাবাদ করে এখন সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক সাথে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদিও হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। জেলায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতিতে এখন চাষাবাদ করা হচ্ছে। যা বদলে দিয়েছে এখানকার কৃষি অর্থনীতি।
জানা যায়, ভোলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমির বড় একটি অংশ একসময় আমন ধান কাটার পর দীর্ঘ সময় অনাবাদি পড়ে থাকত। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পরও জমির নিচু অংশে পানি জমে থাকা কিংবা প্রচলিত চাষাবাদের সীমাবদ্ধতায় অনেক জমিতে নতুন ফসল ফলানো সম্ভব হতো না। তবে সময়ের সঙ্গে কৃষকের অভিজ্ঞতা ও চাষাবাদের কৌশলে এসেছে পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের ধারায় সর্জান বা কান্দি পদ্ধতি হয়ে উঠছে উপকূলীয় কৃষিতে সম্ভাবনাময় এক চাষাবাদব্যবস্থা।
স্থানীয় কৃষকরা এ পদ্ধতিতে জমির উঁচু অংশে মাটি তুলে তৈরি করা হয় কান্দি বা উঁচু বেড। সেখানে চাষ করা হয় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। আর কান্দির মাঝখানের নিচু অংশে জমে থাকা পানি ব্যবহার করা হয় মাছ চাষ কিংবা ধান উৎপাদনে। ফলে একই জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জমির উঁচু-নিচু অংশকে আলাদাভাবে কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা নিশ্চিত করছেন জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার।
এতে একসময় যে জমিতে ফসল কাটার পর নেমে আসত দীর্ঘ অলসতা, সেই জমিতেই এখন ফিরেছে সবুজের প্রাণচাঞ্চল্য। আমন ধান ঘরে তোলার পর মাসের পর মাস পড়ে থাকা জমিতে এখন ফলছে নানা ধরনের সবজি। কোথাও ধানের সবুজের সঙ্গে মিশেছে শাকসবজির সমারোহ, আবার কোথাও পানিতে চাষ হচ্ছে মাছ। প্রচলিত কৃষির চেনা ছক ভেঙে পতিত ও নিচু জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনছেন ভোলার কৃষকেরা।
জেলায় ইতিমধ্যে ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সর্জান বা কান্দি পদ্ধতিতে সমন্বিত চাষাবাদ হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন জমির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কৃষকের বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা।
ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের রতনপুর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, কান্দি পদ্ধতিতে সাজানো জমিতে শোভা পাচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসা, বরবটি, লাউ ও টমেটোর গাছ। একসময় যে জমি মৌসুমের পর দীর্ঘ সময় ফাঁকা পড়ে থাকত, সেখানে এখন কৃষকের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। জমির প্রতিটি অংশকে উৎপাদনের আওতায় আনতে পেরে সন্তুষ্ট স্থানীয় চাষিরা। তাঁদের আশা, আগাম সবজি উৎপাদন করে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি সারা বছর জমি থেকে আয় করা সম্ভব হবে।
কৃষি-সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার মতো উপকূলীয় অঞ্চলে জমির প্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বিত কৃষি পদ্ধতির সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব জমি বছরের একটি বড় সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে বা অনাবাদি পড়ে থাকে, সেসব জমিকে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে কৃষির পরিধি বাড়ানো সম্ভব। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সদর উপজেলার রতনপুরের কৃষক মো. আলামিন বলেন, এই পদ্ধতিতে সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা যায়। জমি আর দীর্ঘ সময় পতিত পড়ে থাকে না। একই জমি থেকে একাধিক ফসল পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
একই এলাকার কৃষক মজিবুর রহমান বলেন,কান্দি পদ্ধতিতে আগাম চাষাবাদ করা সম্ভব হওয়ায় ফসলের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়। পাশাপাশি বাজারে আগাম সবজি বিক্রি করে বাড়তি লাভের সুযোগ তৈরি হয়।
আরেক কৃষক খলিল বলেন, ‘সমন্বিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে আগাম ফসল উৎপাদন করা যায়। মৌসুমের আগেই সবজি বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ থাকে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভের সম্ভাবনাও বাড়ে।
ভোলা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, সর্জান (কান্দি) পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। আগে যেসব জমি দীর্ঘ সময় পতিত থাকত, এখন সেসব জমিতেও বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।
কৃ/স/জয়