প্রিন্ট এর তারিখঃ Nov 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Nov 5, 2026 ইং
কচুরিপানা মারতে বিষ,হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

নাটোর সংবাদদাতাঃ
চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার সময় আসা কচুরিপানা আটকে এখন ব্যাপক আকার ধারনে করেছে। এর কারনে বিলের পানি নামছে না। যার ফলে চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। এই কচুরিপানা মারতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে আগাছানাশক কিটনাশক। এতে এতে বিষাক্ত হচ্ছে বিলের পানি। হুমকিতে পড়ছে মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণী।
বন্যার সময় চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা ডুবে একাকার হয়ে যায়। এসময় পানির স্রোতের সাথে ভেসে আসা ছোট ছোট প্রচুর কচুরিপানা। যা গ্রাম জনপদে আটকে থাকে। পরবর্তীতে এখান থেকে বংশ বৃদ্ধি করে বেড়েওঠে এগুলো। যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। বন্যার পানির সাথে এগুলো নেমে যাওয়ার কথা থাকলেও এখন আর তা হচ্ছে না। বিলের বিভিন্ন পানি প্রবাহের মুখে বাঁধ,পুকুর খনন সহ মাছ ধরার কাটা ধেয়ায় কচুরিপানা বের হতে পারছে না। যা ধীরে ধীরে বংশ বৃদ্ধি করে পুরো বিলে ছড়িয়ে পড়েছে। কচুরিপানায় ঢাকা পড়েছে মাঠের পর মাঠ কৃষি জমি। বন্যার পানি নেমে গেলেও কচুরিপানা মাঠে মাঠে আটকে রয়েছে। যার কারনে এসব জমিতে সমনে রবি সরিষা চাষাবদ করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে তৈরি হচ্ছে একই পরিস্থিতি।
কচুরিপানার বিস্তার ঠেকাতে এবং জমি চাষের উপযোগী করতে বাধ্য হয়ে কৃষকদের একাংশ আগাছানাশক ও বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন। সহজে ও কম খরচে কচুরিপানা অপসারণের আশায় এসব রাসায়নিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে পানি ও মাটিতে রাসায়নিক দূষণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছ, ব্যাঙ, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন প্রাণী।
কৃষকদের ভাষ্য, রবি ফসল ও বোরো ধান চাষের আগে জমি থেকে কচুরিপানা সরাতে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকের সংকট, কোথাও শ্রমিকের বাড়তি মজুরি মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জমি পরিষ্কার করলেও আবার কচুরিপানা জমছে। ফলে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে না পেরে কেউ কেউ জমি অনাবাদি রাখছেন। এ জন্য সহজ পদ্ধতি কিটনাশক প্রয়োগে কচুরিপানা অপসারন। যা মানুষ এভং এখানকার জীব বৈচিত্র্যও জন্য ডেকে আনছে পরিবেশ বিপর্যয়।
কচুরিপানা পরিষ্কারে রাসায়নিক ব্যবহারের প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এসব রাসায়নিক বৃষ্টির পানি ও বিলের পানিতে মিশে জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলছেন পরিবেশবিদরা।
ডাহিয়া গ্রামের কৃষক রুহুল আমিনের চলনবিলে ১৫ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। কিন্তু কচুরিপানার কারণে জমি লিজ দিতে চেয়েও তিনি আগ্রহী কাউকে পাচ্ছেন না।
সিংড়া উপজেলার ইন্দ্রাসন গ্রামের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, বন্যার শুরুতে জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও জমিতে কচুরিপানা জমেছে। এদিকে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, শ্রমিকও সংকট রয়েছে। পাশাপাশি তেল, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি কৃষকদের আরও চাপে ফেলেছে।
কৃষির পাশাপাশি চলনবিলের মৎস্যসম্পদও সংকটের মুখে পড়ছে। বিলের সঙ্গে নদী ও খালের সংযোগস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। এর সঙ্গে নিষিদ্ধ চায়না জালের ব্যবহার যুক্ত হয়ে দেশি প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, কচুরিপানা পরিষ্কারে অবাধে আগাছানাশক প্রয়োগের ফলে বিলের মাছ, পাখিসহ জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এখানকার খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি জাতীয়ভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, কচুরিপানার কারণে কিছু জমি অনাবাদি থাকায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বছরও উপজেলার ৫-৬ হাজার হেক্টর জমিতে কচুরিপানা রয়েছে। কৃষকদের কচুরিপানা অপসারণে আগাছানাশক বা বিষ প্রয়োগ না করে সেগুলো তুলে জৈব সার হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, বিলের সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও নদীর মুখে জাল ও বানা দিয়ে অবৈধভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি এবং অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমিতে পুকুর খনন কচুরিপানা আটকে থাকার কারণ।
কৃ/স/জয়
Email : kshomoynews@gmail.com<br></br>
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ কৃষি সময়