
পিরোজপুর সংবাদাতাঃ
পিরোজপুরে গত বছরের তুলনায় সুপারির ফলন এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ায় হতাশ চাষিরা। বেশি দামে সুপারি কিনে লাভের বদলে ক্ষতির আশঙ্কা পাইকার ও ব্যবসায়ীদের।
জানা যায়,চলতি মৌসুমে জেলায় চার হাজার ৬৬৯ হেক্টর জমিতে সুপারির আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮৪০ থেকে ৯৩০ কোটি টাকা। শুকনো অবস্থায় এই সুপারি প্রতি কেজি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।
পিরোজপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার উৎপাদিত কাঁচা, পাকা, শুকনা ও মাটিতে ভিজিয়ে রাখা (মজা সুপারি) সুপারি আকারে বড়, মানসম্মত ও সুস্বাদু হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, খুলনা, যশোর, রংপুর, ময়মনসিংহ ও পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও এই অঞ্চলের সুপারির বিশেষ স্থান তৈরি হয়েছে।
কাউখালীর ঐতিহ্যবাহী সুপারির হাট, জিয়ানগর বাজার এবং পিরোজপুর সদরের পাঁচপাড়া বাজারের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সুপারি বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। জানা গেছে, পিরোজপুর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সুপারি দেশের চাহিদা মেটানোর পর প্রধানত ভারতে বেশি পাঠানো হয়।
আকর্ষণীয় রং ও বড় আকার হওয়ায় এ অঞ্চলের সুপারির চাহিদা দেশজুড়ে। প্রতি বছর এই সুপারি চাষাবাদ এবং বিক্রি করে চাষী এবং ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও এবার দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।
সুপারি চাষিরা জানান, জেলার সাত উপজেলায় গত বছরের তুলনায় সুপারির ফলন কম হয়েছে। বড় মোকামে চাহিদা কম থাকলেও স্থানীয় বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে। ফলে কম ফলনেও ভালো দাম পাচ্ছেন তারা। তবে বাজারজুড়ে বেচাকেনার এমন কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও কম ফলনে হতাশ চাষিরা।
পিরোজপুরের অন্যতম বড় তিনটি সুপারির হাট জিয়ানগর বাজার, কাউখালী বাজার ও পিরোজপুর সদরের পাঁচপাড়া বাজার। সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার হাটগুলোতে কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হয়। এই তিনটি হাটকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যারা প্রতিদিন এক থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। বর্তমান বাজারে প্রতি কুড়ি সুপারি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। জেলায় ছোট-বড় প্রায় ৭০টি সুপারির হাট রয়েছে।
সুপারি চাষী আলী আশরাফ জানান বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর সুপারির ফলন হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ। তবে বাজারে গতবারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দাম পাচ্ছেন। ফলন কম হওয়ার কারণ আল্লাহই ভালো জানেন। তাদের এলাকায় শতকরা ৮০ শতাংশ মানুষ সুপারির ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে কৃষি অফিস থেকেও কোনো পরামর্শ পান না তারা।
জিয়ানগরের ইন্দুরকানী গ্রামের সুপারি চাষি মো. কবির হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর সুপারির ফলন কম হয়েছে। তিনি এক কুড়ি সুপারি ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। সুপারির ফলন কম হলেও দাম কিছুটা বেশি। বর্তমানে সুপারি বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। আবহাওয়ার কারণে ফলন কম হতে পারে। তবে সুপারি চাষে কৃষি অফিস থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি।
উপজেলার ঘোষেরহাট বাজারসংলগ্ন এক ব্যবসায়ী মো. এবাদুল সিকদার বলেন, সুপারির ব্যবসা এ বছর খারাপ যাচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ ফলন হচ্ছে। ফলন কম হওয়ায় বেশি দামে সুপারি কিনতে হয়। ফলন কম হওয়ায় মোকামেও দাম কম। এ কারণে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রতি হাটে সাত থেকে আট লাখ টাকার সুপারি কিনি। এসব সুপারি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। যেমন ঢাকা, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, সৈয়দপুর ও পঞ্চগড়সহ বেশ কিছু এলাকায় সুপারি পাঠানো হয়।
জিয়ানগর হাটে সুপারি কিনতে আসা নীলফামারীর সৈয়দপুরের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, এবার সুপারির দাম বেশি। যে দামে কিনছেন, সেই দামে বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। লাভের পরিমাণ খুবই কম। ব্যবসার ক্ষেত্রে কিছু মাল মজুত করতে হয়। কিছু মাল মজুত করতে পারলে লাভবান হওয়া যাবে বলে মনে করছেন তিনি।
কাউখালী বাজারের ইজারাদার রফিকুল ইসলাম বলেন, এটি শত বছরের পুরোনো বাজার। এই বাজারে সরকারের নির্ধারিত মূল্যেই খাজনা নেওয়া হয়। এ কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে চাষিরা এখানে সুপারি বিক্রি করতে আসেন। এই উপজেলায় সুপারির ব্যবসা মূল ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। খাজনা কম নেওয়ার কারণে সাধারণত দূর-দূরান্ত থেকে চাষিরা এ বাজারে সুপারি বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন।
পিরোজপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুরের সুপারির রং ভালো এবং আকারেও বড়। এ কারণে এর চাহিদা বেশি। এখানকার সুপারি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সুপারি চাষে নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শসহ চাষিদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
কৃ/স/জয়