প্রিন্ট এর তারিখঃ Nov 2, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Nov 1, 2026 ইং
সুন্দরী গাছ কার্বন শোষণের ক্ষমতা হারিয়েছে

খুলনা সংবাদদাতাঃ
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত এবং প্রাকৃতিক বৈরিতায় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাণকেন্দ্রের প্রতীকী গাছ ‘সুন্দরী’ আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। মিষ্টি পানির প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততার মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বনের প্রধান এই গাছটিতে দেখা দিয়েছে ভয়ঙ্কর আগামরা রোগ।
এতে বনের সামগ্রিক কার্বন শোষণের সক্ষমতা ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশ কমে গেছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবেশবিদ ও বন গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের এই পরিবেশগত অবনতি কেবল একটি নির্দিষ্ট গাছের সংকট নয়; এটি গোটা উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষায় এক বিরাট অশনিসংকেত।
সুন্দরী গাছের সংখ্যা, স্বাস্থ্য ও বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটলে সুন্দরবনের সামগ্রিক বৃক্ষবিন্যাসে প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি বন্য প্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল এবং অন্যান্য উদ্ভিদপ্রজাতির বিকাশেও পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, কোথাও কোথাও সুন্দরীর পরিবর্তে অন্য প্রজাতির গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সুন্দরবন শুধু দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অঙ্াইড শোষণ করে কার্বন সঞ্চয়ে সহায়তা করে। গবেষণায় সুন্দরবনের কার্বন শোষণের সক্ষমতা ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য উঠে আসায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুন্দরী গাছের স্বাস্থ্যহানি, গাছের বৃদ্ধি ও পুনর্জন্মের পরিবর্তন এবং বনের সামগ্রিক প্রতিবেশগত অবস্থার অবনতি কার্বন সঞ্চয়ের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ সুন্দরবনের পরিবেশগত সক্ষমতা দুর্বল হলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ মোকাবিলায় প্রথমে প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, রোগাক্রান্ত গাছের অবস্থা নিরূপণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে মাটির লবণাক্ততা, মিষ্টি পানির প্রবাহ, নদী-খালের নাব্যতা, পলি জমার ধরন এবং প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের পরিবর্তন নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা জোরদার করা দরকার।
এ ছাড়া সুন্দরবনের প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, বন ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। রোগাক্রান্ত গাছের অবস্থা ও নতুন চারার বিকাশ নিয়মিত মূল্যায়ন করা গেলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিরূপণ ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে।
অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল কাদির জানান, মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরী গাছের বৃদ্ধি ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। গাছের গোড়া বা মাঝখান থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ওপরের দিক (আগার অংশ) শুকিয়ে মারা যাওয়ার এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়াকে বলা হয় আগামরা রোগ। দুর্বল হয়ে পড়া এসব গাছে খুব সহজেই রোগজীবাণু, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঘটে। এর বিপরীতে লবণসহিষ্ণু অন্যান্য প্রজাতির গাছ যেমনÑ গেওয়া, বাইন ও কেওড়ার বিস্তার বাড়ছে। এভাবে সুন্দরবনের উদ্ভিদবৈচিত্র্যে পরিবর্তন ঘটছে এবং সুন্দরী গাছ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের এই সংকট শুধু একটি বৃক্ষপ্রজাতির রোগের বিষয় নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনের পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সুন্দরী গাছের ক্ষয় এবং বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মে পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
কৃ/স/জয়
Email : kshomoynews@gmail.com<br></br>
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ কৃষি সময়