
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতাঃ
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার হাওরাঞ্চলে এখন দেশীয় মাছ মিলছে না। এক সময় এখানকার খাল-বিলে প্রচুর দেশি মাছ মিলতো। কিন্তু এখন আর তার দেখা মিলছে না। এখন সারাদিন এ উপজেলার নধী-নালা,খাল-বিলে দিনভর চেষ্টা করেও কাঙ্খিত দেশি মাছ মেলে না। স্থানীয়রা বলছেন, ধানিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়াসহ নানা কারণে কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য।
এক সময় হাওরের পানি কমতে শুরু করলেই গ্রামের মানুষ মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠতেন। নদী, খাল, বিল ও হাওরের ডোবায় মিলতো পুঁটি, ভেদা, পাবদা, শোল, গজার, বোয়ালসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। জাল, বর্শি কিংবা বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদে ধরা পড়ত প্রচুর মাছ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ও বর্শি ফেলেও অনেক সময় ফিরতে হচ্ছে প্রায় খালি হাতে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব মাছের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। শোল, রুই ও কাতলার মতো মাছ বাজারে পাওয়া গেলেও উন্মুক্ত জলাশয়ে সেগুলোর প্রাচুর্য আর আগের মতো নেই।
স্থানীয় মাছ শিকারিদের ধারণা, জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের প্রভাবে পানির গুণগত মান ও জলজ পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। এতে দেশীয় মাছের বিচরণ, বেঁচে থাকা ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে।
দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার পেছনে হাওরের বিভিন্ন বিলে বিষ প্রয়োগের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, কোনো কোনো বিলে মাছ ধরতে বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট পোনা ও মাছের ডিমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকার একটি ধান চাষ। ফসল উৎপাদন বাড়াতে কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদানের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি বা জমির পানি জলাশয়ে মিশে যাওয়ার ফলে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দিরাইয়ের মাছ শিকারি খালেক, জুয়েল ও মাছুমের ভাষ্য, আগে জাল কিংবা বর্শি পানিতে ফেললেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় সামান্য মাছ নিয়ে ফিরতে হয়। তাদের মতো মাছ শিকারিদের কাছে মাছ শুধু খাদ্য নয়, জীবিকা নির্বাহেরও অন্যতম অবলম্বন। জলাশয়ে মাছ কমে যাওয়ায় তাদের আয়েও প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে উন্মুক্ত জলাশয়ের দেশীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চ্যাপ্টির হাওরপাড়ের বাসিন্দা লিটন দাস বলেন, হাওরের বিভিন্ন বিল ইজারা দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, কোনো কোনো ইজারাদার বিলে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরেন। এতে মাছের পোনা ও ডিম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, জলাশয়ে ক্ষতিকর বিষ প্রয়োগ বন্ধ, কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত এবং বিল ইজারার ক্ষেত্রে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
দিরাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মতে, ধানিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মিঠাপানির দেশীয় মাছের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এ বিষয়ে কৃষক সহ স্থানীয়দের সচেতন হতে হবে।
কৃ/স/জয়