
পাবনা সংবাদদাতাঃ
পাবনায় কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত ১৭টি পালিনেট হাউস এখন বেহাল হয়ে পড়েছে। কৃষির আধুনিকায়নে এসব নির্মাণ করা হলেও প্রায় সবগুলো হাউস পলিথিন ছিঁড়ে গেছে। লোহার কাঠামো কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও খালি জমি পড়ে আছে। ভেতরে কোনো ফসল নেই। চার বছরে প্রকল্পের এই দশায় কৃষকদের কোন কাজেই আসছে না। এতে সরকারে বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যায় নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়,বিগত সরকারের আমলে পানা জেলায় কৃষির আধুনিকায়নে ১৭টি পলিনেট হাউস নির্মাণ করা হয়। রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি পলিনেট হাউস নির্মাণে ২৪ লাখ টাকা খরচ হয়। উদ্দেশ্য ছিলো এর ভিতরে কৃষকরা বছরজুড়ে উচ্চ মূল্যের সবজি সহ ফসল চাষাবাদের। তবে চার বছরেও কৃষকদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এসব হাউসগুলো প্রায় সবগুলোই এখন অচল অকেজো হয়ে পড়েছে। এগুলোর ভিতর অতরিক্ত তাপে গাছ ও চারা নষ্ট হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনায় লোকসানে পড়েছেন চাষিরা।
জেলার সাথিয়া ও ঈশ্বরদী উপজেলার কয়েকটি হাউস ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ হাউসের পলিথিন ছিঁড়ে গেছে। লোহার কাঠামো কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও খালি জমি পড়ে আছে। ভেতরে কোনো ফসল নেই। অনেক চাষি বাধ্য হয়ে সেখানে আঙুরগাছ লাগিয়ে রেখেছেন।
শুরুতে আধুনিক প্রযুক্তিতে সারা বছর ক্যাপসিকাম, টমেটোসহ উচ্চমূল্যের ফসল চাষের আশায় ছিলেন কৃষকরা। তবে চার বছরেও তারা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাননি।
ঈশ্বরদী উপজেলার বখতারপুর গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম সরকার পলিনেট হাউস নিয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওই জমি অন্য কারও কাছে ইজারা দিলে বছরে এক লাখ টাকা পাওয়া যেত। হাউসের ভেতরে তাপমাত্রা এত বেশি থাকে যে কোনো ফসল টিকতে পারে না। বাধ্য হয়ে পলিথিন খুলে ফেলেছি। এখন বাইরে সাধারণ পদ্ধতিতে ফসল চাষ করছি।’
সাঁথিয়ার মাধপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম ফকিরের হাউসের বেহাল অবস্থা । তার পলিনেট হাউসের ওপরের নেট ঝড়ে ছিঁড়ে গেছে। বৃষ্টির পানি জমে পুরো এলাকা জলমগ্ন। তার অভিযোগ, হাউসের ভেতরে তাপমাত্রা এত বেশি থাকে যে, সকাল ১০টার পর কাজ করা যায় না। চারা ও শাকসবজিও তাপে ঝলসে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকা মিস্ট ও ড্রিপ সেচব্যবস্থার বেশির ভাগই অচল। ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত আয়রন ও খর পানির কারণে যন্ত্রগুলো দ্রুত নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। তাদের অভিযোগ, নিম্নমানের উপকরণ ও কম মাইক্রোনের পলিথিন ব্যবহারের কারণে হাউসগুলো টেকসই হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণের কথা থাকলেও এক বছর পর আর কেউ খোঁজ নেননি।
হাউসের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরাও সমস্যায় পড়ছেন। শ্রমিক বাবুল হোসেন, আজগর আলী ও হাসু খাঁ জানান, সকাল ১০টার পর অতিরিক্ত গরমে সেখানে কাজ করা যায় না।
ঈশ্বরদী উপজেলার জাতীয় পদকপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তা বেইলি বেগমের অভিযোগ, প্রতিশ্রুত মানের উপকরণ দেওয়া হয়নি। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও কারিগরি ত্রুটিতে কৃষকরা লোকসানে পড়েছেন। জমিতে সাধারণ সবজি চাষ করে বা জমি লিজ দিয়ে যে আয় হতো, সে হিসাবেও তারা অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পাবনার খ্যাতিমান চাষি শাহজাহান আলী বাদশা জানান, তিনি নিজেও এ প্রকল্পের ভুক্তভোগী। শীতপ্রধান দেশের আদলে তৈরি হাউস বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী করতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ফসল ভেদে প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের আলাদা ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু হাউসগুলোতে প্রায় সব ফসলের জন্য একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এসব বিষয়ে কথা হলে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান দাবি করেন, কৃষকরা পরিশ্রম করতে চান না এবং পরামর্শ না মানায় সফল হননি।
কৃ/স/জয়