প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 17, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Oct 17, 2026 ইং
ঔষধি গ্রামে ১০ হাজার মানুষের ভাগ্যবদল

নাটোর সংবাদদাতাঃ
নাটোরের দুটি ইউনিয়নে চাষাবাদ হচ্ছে নানা ঔষধি গাছ। এসব গাছ চাষাবাদ ও বিক্রি করে ভাগ্য বদলেছে এখানকার ১৬টি গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষের। বছরে শতকোটি টাকার গাছ-গাছরা বিক্রি করছেন তারা। যা এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতিকে করেছে গতিশীল ও শক্তিশালী।
নাটোর কৃষি বিভাগের তথ্যনুর্যায়ী , এ এলাকায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ হয়। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টরে অ্যালোভেরা, ৫০ হেক্টরে শিমুলমূল এবং বাকি ৩০ হেক্টরে অন্যান্য ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করা হয়। বছরে এখানে প্রায় ১৫ হাজার টন অ্যালোভেরা উৎপাদিত হয়। সব মিলিয়ে এলাকায় চাষ হয় প্রায় ১৫০ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ।
নাটোরের লক্ষীপুর ও লোখাবাড়িয়া ইউনিয়ন। এই দুটি ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ চাষাবাদ হচ্ছে। এসব গ্রামের চারদিকে সবুজ। যেখানে মাঠের পর মাঠে চাষ হচ্ছে অ্যালোভেরা। পাশের জমিতে শতমূলী, ঘৃতকাঞ্চন, শিমুলমূল, অশ্বগন্ধা ও রোজেলা। বাড়ির উঠানেও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ। এসব ভেষজ উদ্ভিদ ঘিরেই গড়ে উঠেছে মানুষের জীবন-জীবিকা। স্থানীয়ভাবে ঔষধি গ্রাম নামে পরিচিত এই পল্লীতে ভেষজ চাষ, প্রক্রিয়াজাত, বিপণন ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বছরে প্রায় শতকোটি টাকার বাণিজ্য এই গ্রাম থেকে।
একসময় অভাব-অনটনে থাকা এখানকার গ্রামের মানুষের কাছে ভেষজ চাষ এখন প্রধান অর্থকরী কর্মকাণ্ড। এই চাষের ওপর ভর করে অনেক কৃষক হয়েছেন স্বাবলম্বী। কেউ চাকরি ছেড়ে ফিরেছেন গ্রামে, কেউ আবার কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসা। এই চাষাবাদকে ঘিরেই চলছে তাদের সংসার।
১৯৯৫ সালের দিকে কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার হাত ধরে এই ঔষধি গ্রামের যাত্রা। তিনি খোলাবাড়িয়ায় নিজের বসতবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছের চাষ শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করতেন এসব গাছের চারা ও বীজ। তার উদ্যোগ দেখে আশপাশের গ্রামের মানুষও ভেষজ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। আফাজ উদ্দিন মারা যাবার পরে তার দেখানো পথ ধরে এখন এই পেশায় গ্রামের অনেক মানুষ জড়িয়ে পড়েছেন। এটাই এখন তাদেও পেশা।
এখানে অ্যালোভেরা প্রধান উৎপাদিত ভেষজ পণ্য। প্রতিদিন ট্রাকে করে এসব পাতা দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ওষুধ, প্রসাধনী, জুস ও শরবত তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে অ্যালোভেরার চাহিদা রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত তাইওয়ান সিন লিন এন্টারপ্রাইজও এখানকার অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভেষজ কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি পণ্যের কিছু অংশ বিদেশেও রপ্তানি হয়।
অ্যালোভেরার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে রোজেলা চাষ। ২০১৭ সালে প্রথম রোজেলা চাষ শুরু করেন শহিদুল ইসলাম। এ বছর তিনি দুই একর জমিতে এই উদ্ভিদ চাষ করেছেন। তার চাষ দেখে স্থানীয় আরও অনেক কৃষক রোজেলা উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছেন।
শুধু ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই এই পল্লীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার কাজেও যুক্ত হয়েছেন অনেকে। লক্ষীপুর বাজারের ভেষজ পণ্যের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন তাদের একজন। তিনি জানালেন, নিজেদের উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে গুঁড়া ও হালুয়া তৈরি করেন। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন তিনি।
খোলাবাড়িয়া গ্রামের সৌরভ হোসেন। ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন । পরে সেই চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে শুরু করেন অ্যালোভেরা চাষ। এখন তার দুই বিঘা জমিতে এই ভেষজ উদ্ভিদ চাষ হচ্ছে। পাতা বিক্রি করেই তার সংসার চলে। তার মতো এলাকার অনেক তরুণ বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করে আয় করছেন।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলামের জানান, ভেষজ উদ্ভিদ চাষের মাধ্যমে ১৫-১৬ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত ভেষজ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। অ্যালোভেরা এখানকার অন্যতম প্রধান উৎপাদিত পণ্য, যা শরবতসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা বাড়ানো এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
কৃ/স/জয়
Email : kshomoynews@gmail.com<br></br>
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ কৃষি সময়