
গাজীপুর সংবাদদাতাঃ
ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন দুটি গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবার। যার মাধ্যমে কর্ম সংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। বছরে এ কাজের মাধ্যমে তারা আয় করছেন কয়েক কোটি টাকা। গাজীপুরের শ্রীপুরের দরগাচালা ও ডালেশ্বর গ্রামে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলছে এই ভেষজ উদ্ভিদের বেচাকেনা। এর মাধ্যমে গ্রাম দুটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ওষুধি গ্রাম’ হিসেবে।
শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়নের দরগাচালা ও ডালেশ্বর গ্রাম। ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও ব্যবসার জন্য এলাকায় আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে গ্রাম দুটির। প্রতিদিন ভোর থেকেই বিভিন্ন বয়সি মানুষ ছুটে যান আশপাশের বন-জঙ্গল, মাঠ, জলাশয় ও বিভিন্ন এলাকায়। কেউ সংগ্রহ করেন গাছের ছাল, কেউ পাতা, ফুল, লতা কিংবা শিকড়। আবার কেউ স্থানীয় কৃষক ও সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কিনে নেন এসব ভেষজ উপাদান|
সংগ্রহ করা এসব উপকরণের মধ্যে রয়েছে অর্জুনের ছাল, বাসক পাতা, নিমপাতা ও নিমের ছাল, আমলকি, হরতকি, পেঁপে, বহেরা, লজ্জাবতী, শাপলাসহ বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ। সংগ্রহের পর শুরু হয় বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। বাড়ির আঙিনা, খোলা জায়গা কিংবা সড়কের পাশে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয় এসব উপাদান। এরপর চাহিদা অনুযায়ী বস্তাবন্দি করে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পাইকারদের মাধ্যমে এসব ভেষজ উপাদান পৌঁছে যায় হারবাল ও ইউনানী ওষুধ প্রস্তুতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পেশা এখন আর শুধু ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভেষজ ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র। সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে বাছাই, শুকানো, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, পরিবহন ও পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন কয়েক হাজার মানুষ।
শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের এলাকার দুই সহস্রাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত এই কাজে। ভেষজ বাণিজ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বড় অর্থনৈতিক বলয়। আর ভেষজ উদ্ভিদের উৎপাদন ও ব্যবসার কারণে ডালেশ্বর পেয়েছে ‘ওষুধি গ্রাম’-এর স্বীকৃতি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বছর এই গ্রামগুলোতে ভেষজ উপাদানকে ঘিরে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক পরিবার ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি নারীরাও বাছাই, পরিষ্কার ও শুকানোর কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয়ে ভূমিকা রাখছেন। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের পথ তৈরি হয়েছে।
মো. নাঈম যুক্ত আছেন দীর্ঘদিন। তিনি বলেন, শুধু বন জঙ্গলই নয়, বাড়ির উঠানেও এখন আমরা ওষুধি গাছ রোপণ করে থাকি। নিমপাতা, সজনে পাতা, পেঁপে, বয়রা, আমলকী, শাপলা, ক্ষুদেমানিকসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল শুকিয়ে ভেষজ ওষুধ কোম্পানির কাছে সরবরাহ করে থাকে।
তিন প্রজন্ম ধরে একই কাজ করছেন ডালেশ্বর গ্রামের মো. সুমন মিয়া। তিনি বলেন, এ ব্যবসা আমার দাদার বাবা শুরু করেছিলেন। আমার দাদা করেছেন, সেখান থেকে আমার বাবা করেছেন, বাবার কাছ থেকে আমি করছি। আমাদের এখানে তিনশোর ওপর আইটেম পাওয়া যায়। এসব কাজের সঙ্গে তিন ধরনের লোক জড়িত। বিভিন্ন গ্রামের বনজঙ্গল, পাহাড়ি এলাকা থেকে ওষুধি গাছ সংগ্রহ করে আমাদের কাছে দেয়। আমরা সেগুলোকে কাটিংসহ নানা ধরনের প্রসেসিং করে শুকিয়ে রাখি। পরে দেশের ভেষজ ওষুধ উৎপাদানকারীরা নিয়ে যায়। এ কাজে গ্রাম দুটির ৩০০ থেকে ৩৫০ পরিবারের কর্মসংস্থান হয়েছে।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, ওষুধি গাছের পাতা, ছাল বিক্রি করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে। এরকম গ্রাম আরও গড়ে উঠুক। বাড়ির আঙিনায় ওষুধি গাছগুলো চাষে উদ্বুদ্ধ করাসহ এসব গাছের চারা বিতরণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃ/স/জয়