প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 1, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Oct 1, 2026 ইং
সার পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় কৃষক দল নেতা!

কৃষি সময় প্রতিবেদক
সার সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার যখন সার আমদানি করে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে ৭৫ হাজার টন এমওপি সার পরিবহনের দুই দরপত্রে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ না নেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) আহ্বান করা দুটি দরপত্রের একটিতেও নির্ধারিত সময়ে কোনো দরদাতা না পাওয়ার পেছনে ঠিকাদারদের মধ্যে ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠেকাতে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। এ ঘটনায় জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক হাজী মো. কামাল হোসেনের নামও এসেছে। তবে তিনি কাউকে হুমকি বা চাপ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ৪০ হাজার টন এমওপি সার দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনের জন্য একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই দিনে আরও ৩৫ হাজার টন এমওপি সার পরিবহনের জন্য পৃথক দরপত্র দেওয়া হয়। উভয় দরপত্রের জমাদানের শেষ সময় ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা। নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে ৭৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়া ও কানাডা থেকে সার আমদানির দুটি প্রস্তাব অনুমোদন করে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কয়েকজনের অভিযোগ, দরপত্র জমা দেওয়ার আগে থেকেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। বিএডিসি কার্যালয়ের আশপাশে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোকজন অবস্থান করছিলেন বলেও তাদের কেউ কেউ দাবি করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন ঠিকাদার জানান, দরপত্র জমা দেওয়ার আগে তাকে সতর্ক করা হয়েছিল—সেদিন বিএডিসি কার্যালয়ে গেলে ঝামেলায় পড়তে পারেন। এ কারণে তিনি দরপত্র জমা দিতে যাননি বলে দাবি করেন।
বিএডিসির একটি সূত্রের অভিযোগ, কৃষক দলের বেশ কিছু নেতাকর্মী করপোরেশনের কার্যালয়ে গিয়ে দরপত্র নিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া কেউ দরপত্রে অংশ না নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলেও সূত্রটির দাবি। এ ঘটনায় হাজী কামালের নেতৃত্বের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হাজী কামাল অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেছেন, কাউকে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হয়নি। সময় ব্যবস্থাপনা করতে না পারার কারণে সংশ্লিষ্টরাও দরপত্রে অংশ নিতে পারেননি বলে তিনি দাবি করেন।
হাজী মো. কামাল হোসেন বর্তমানে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যিনি আবার বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)-এর পরিচালক। যার চেয়ারম্যান মোশাররফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মুন্সিগঞ্জের বিএনপিনেতা মো. মোশাররফ হোসেন।
সার পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিএফএর সঙ্গে হাজী কামালের সম্পৃক্ততা এবং তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাম্প্রতিক দরপত্রের ঘটনাটি নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’ ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে খুচরা বিক্রেতা শ্রেণিতে বিএফএর সদস্য হয়েছে।
বিএফএর কয়েকজন জেলা পর্যায়ের সদস্যের অভিযোগ, হাজী কামাল প্রায়ই দলবল নিয়ে সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থান করেন এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাব হিসেবে ব্যবহার করেন। তাদের কারও কারও দাবি, সংগঠনের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন হলেও বিভিন্ন কার্যক্রমে হাজী কামালের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। তিনি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুনিরে ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই এই প্রভাব বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সার খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের সার পরিবহন দরপত্রে কোনো দরদাতা না পাওয়া স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপেই দরপত্রে কেউ অংশ নেয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি, ঠিকাদারদের বক্তব্য এবং বিএডিসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রয়োজন।
দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ না নেওয়ায় বিএডিসিকে এখন নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় যেতে হচ্ছে বলে জানা যায়। এতে সার পরিবহনের কার্যাদেশ দিতে বিলম্ব হলে আমদানি করা সার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। বন্দর বা গুদামে দীর্ঘ সময় সার পড়ে থাকলে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে বোরো-পূর্ব কৃষি মৌসুমে সার সরবরাহের সময়সূচিতে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব কৃষকের পর্যায়ে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএডিসির মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ব্যবস্থায় আমদানি করা বিভিন্ন নন-ইউরিয়া সার দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনের কাজ করে থাকে। ফলে পরিবহন কার্যক্রমে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা ও সময়মতো ঠিকাদার নিয়োগ সার সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু বিএডিসি নয়, বিসিআইসির সার পরিবহন নিয়েও বড় ঠিকাদারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন দাবি করেছেন।
এসব বিষয়য়ে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিএডিসির ঘটনার সঙ্গে দলের কেউ জড়িত থাকার নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, কৃষক দলের নেতাকর্মীদের টেন্ডারবাজির কোনো রেকর্ড নেই।
সার খাতে অতীতের অনিয়মের প্রসঙ্গও সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সার পরিবহনকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী চক্র বা ‘প্রোটন সিন্ডিকেট’ সক্রিয় ছিল। যার হোতা আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি প্রোটনকে জেলে যেতে হয়।
বর্তমানে দেশে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সরকারি সার পরিবহনের একটি বড় দরপত্রে একটিও দরদাতা না পাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলে গুরুত্ব পেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নজরদারি বাড়ছে বলে জানা গেছে।
সার সরবরাহের মতো স্পর্শকাতর একটি খাতে সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, ঠিকাদারদের নিরাপত্তা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ।
Email : kshomoynews@gmail.com<br></br>
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ কৃষি সময়