
ঝালকাঠি সংবাদদাতাঃ
ঝালকাঠির সুগন্ধা, বিষখালী, হলতা ও গাবখান নদীর পাড়ের জেলেদের জীবনে আনন্দের বদলে নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। নদীতে দিনরাত জাল ফেলে কোন ইলিশের দেখা পাচ্ছে না। দিনভর নদীতে ঘুরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে নৌকার জ্বালানি, বরফ, জালের খরচসহ দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় তারা নিজেদের সংসার চালানো আর ঋণের কিস্তির পরিশোধ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া,দেউরি গ্রামের সুগন্ধা নদীপাড়,বাদুরতলা, চল্লিশকাউনিয়া বিষখালী নদীর পাড়ে গিয়ে জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়,ইলিশের মৌসুমকে ঘিরে তারা কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেন। কেউ নৌকা মেরামত করেন, কেউ নতুন জাল কেনেন, আবার কেউ পুরোনো জাল সংস্কার করেন। এসব কাজে প্রয়োজন হয় বড় অঙ্কের টাকা। অনেকের সেই টাকা নিজের হাতে থাকে না। ফলে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়, আবার অনেকে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেন। তাদের আশা থাকে, মৌসুমে ভালো ইলিশ পাওয়া গেলে মাছ বিক্রির আয় থেকে একদিকে সংসার চলবে, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি ও দাদনের টাকা পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু এবার সেই হিসাব বারবারই ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
বাদুরতলা এলাকার কাদের মাঝি বলেন, বিষখালী নদীতে অনেক বছর মাছ ধরে সংসার চালাই। এই সময়টাতে আমরা ইলিশের আশায় নদীতে নামি। কিন্তু এবার নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছি না। সারাদিন নদীতে থাকার পর যে মাছ পাই, তা দিয়ে নৌকার তেল, জাল ও অন্যান্য খরচই ঠিকমতো ওঠে না। অথচ সংসারের খরচ তো আছেই, তার ওপর ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। নৌকা-জাল ঠিক করার জন্যও টাকা ধার করেছি। আশা ছিল ইলিশ ধরে সেই টাকা পরিশোধ করব। এখন মাছ কম পাওয়ায় কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তো নদীতে নামতেও পারব না। তাই সামনে কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।
সদর উপজেলার দেউরি গ্রামের জেলে নুরু মিয়া বলেন,জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই সুগন্ধা আর বিষখালী নদীতে মাছ ধরে কাটিয়েছি। নদীর কোন জায়গায় কখন ইলিশ থাকে, কোথায় জাল ফেললে মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশিÑএসব অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। কিন্তু এবার নদীর অবস্থা একেবারেই আলাদা। জাল ফেলছি, নদীতে ঘুরছি, কিন্তু আগের মতো ইলিশ পাচ্ছি না। কখনো সারাদিনে যে পরিমাণ মাছ পাই, তা দিয়ে নৌকার তেলের খরচও ঠিকমতো ওঠে না। এই বয়সে নদীতে না নেমে উপায়ও নেই, কারণ মাছ ধরেই সংসার চালাতে হয়। ইলিশের মৌসুমে ভালো মাছ পাব, কিছু টাকা জমাবÑএই আশাতেই সারা বছর অপেক্ষা করি। কিন্তু এবার মাছ কম থাকায় খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে ইলিশ আহরণের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে জাল ফেলেন কয়েকশ জেলে। বছরের এই কয়েক মাসের আয়ের ওপর অনেক পরিবারের বাকি সময়ের জীবনযাত্রা নির্ভর করে। মাছ ধরার আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, নৌকা ও জালের খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ না পাওয়ায় সেই আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। জেলেদের ভাষায়, নদীতে মাছ না থাকলে শুধু মাছ বিক্রির আয়ই কমে না; একই সঙ্গে বাড়তে থাকে ধার-দেনা। কারণ নদীতে নামতে হলেও জ্বালানি লাগে, বরফ লাগে, খাবার লাগে এবং নৌকা-জালের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। মাছ না উঠলে এসব খরচও অনেক সময় উঠে আসে না।
সুগন্ধা নদীর পাড়ে বাঁধা নৌকাগুলো শুধু মাছ ধরার বাহন নয়Ñএসব নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত পরিবারের স্বপ্ন, ঋণ, সংসার আর ভবিষ্যৎ। জালগুলো শুধু মাছ ধরার উপকরণ নয়; এগুলো দিয়েই সন্তানদের পড়াশোনা, ঘরের খাবার, চিকিৎসা আর বছরের প্রয়োজনীয় খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন জেলেরা। কিন্তু নদীতে যখন ইলিশ কমে যায়, তখন শুধু জেলেদের জালই খালি থাকে নাÑখালি হয়ে যায় তাঁদের সংসারের হিসাবের খাতাও। সুগন্ধার পাড়ে তাই এখন জেলেদের চোখ নদীর দিকে। তাদের অপেক্ষা এক ঝাঁক ইলিশের জন্য। কারণ সেই ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের আশা, দাদনের টাকা শোধ করার চিন্তা এবং পরিবারের আগামী দিনের বেঁচে থাকার হিসাব।
জেলেদের অভিযোগের সঙ্গে মৎস্য বিভাগের হিসাবেও কিছুটা মিল পাওয়া যাচ্ছে। ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের জুন থেকে সেপ্টেম্বরÑএই চার মাসে জেলায় যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয়েছে, তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি।
ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, দেশের অন্যান্য জেলার নদ-নদীতে এ বছর ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়লেও সেই তুলনায় সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কম। নদীর পানির দূষণ ও পলি জমার কারণে এমনটা হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
কৃ/স/জয়