প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 24, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Sep 24, 2026 ইং
ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই

নীলফামারী সংবাদদাতাঃ
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সমতলে আগাম আমন ধান কাটার ধুম পড়েছে। মাঠে মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছে চাষীরা। ধানের ভাল ফলন হলেও চাষীদের মুখে হাসি নেই। ধান বিক্রি করে উৎপাদন করচ তোলার শঙ্কায় পড়েছেন এখানকার চাষীরা।
জানা যায়,কিশোরগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৪ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে আগাম ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। উপজেলার মাঠে মাঠে উচ্চফলনশীল ও স্বল্প জীবনকালের ব্রি-ধান ৯৪ সহ বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের চায়না ধান আবাদ করেছেন।
বিগত কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ উঁচু জমি কাজে লাগিয়ে নিষ্ফলা ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আগাম আমন ধানের আবাদ করে আসছেন। ভালো ফলন ও দাম পাওয়ার পাশাপাশি ওই অনটনের দিনগুলোতে খাদ্যের জোগান দিয়ে অতীতে মঙ্গা বা আকাল তাড়িয়েছেন তাঁরা। ফলে এক চিলতে জমিও পতিত না রেখে কৃষকেরা দিন দিন এ ধান চাষে ঝুঁকেছেন।
এ উপজেলায় এবার অনুকূল আবহাওয়া, নিবিড় পরিচর্যা এবং কৃষি অফিসের পরামর্শে ফলনও হয়েছে চমৎকারÑপ্রতি বিঘায় মিলছে ১৪ থেকে ১৮ মন ধান। তবে বাম্পার ফলনে কৃষকের মনে আনন্দের জোয়ার ভাসলেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম না থাকায় মুহূর্তেই তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
সবকিছুর দাম বৃদ্ধিতে হালচাষ, রোপণ, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, নিড়ানি ও কাটা-মাড়াই মিলিয়ে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে প্রতি মন ধানের দর মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি বিঘায় কৃষকের আয় হচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণছেন ধান চাষিরা।
সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, মাঠজুড়ে আনন্দঘন পরিবেশে চলছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। কেউ কাস্তে দিয়ে ধান কেটে প্লাস্টিকের নেটে রেখে মাড়াই করছেন, আবার কেউ দ্রুতগতিতে কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের সাহায্য নিচ্ছেন। জমি ফাঁকা হতেই আগাম আলু ও শীতকালীন সবজি চাষের জন্য গোবর সার ছিটিয়ে জমি প্রস্তুত শুরু হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে মাঠজুড়ে কৃষক-শ্রমিকের পদচারে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে।
পুটিমারী ইউনিয়নের পুটিমারী চণ্ডির বাজার ব্লকের চাষি নূর মোহাম্মদ ওরফে সোনা বলেন,ভালো লাভের আশায় এবার ১৩ বিঘা জমিতে চায়না জাতের আগাম ধান চাষ করেছিলাম। বিঘা প্রতি খরচ ১৫ হাজার টাকা হলেও ১৮ মন ধানের বাজারমূল্য পেয়েছি মাত্র ৯ হাজার ৩৬০ টাকা। খড় বিক্রি করে এসেছে দেড় হাজার টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৩ বিঘায় লোকসান ৫২ হাজার টাকা। এই ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠা কঠিন।
বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিম পাড়া ব্লকের বর্গা চাষি মফিজ উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন,এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সোয়া দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছে ৩৩ হাজার টাকা, আর ২৯ মন ধান বিক্রি করে পেয়েছি মাত্র ১৫ হাজার টাকা। ১৮ হাজার টাকা মূলধন গায়েব! এখন ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করব তা নিয়ে চরম চিন্তায় আছি।
এই চাষীদের মতো উপজেলার প্রায় প্রতিটি ধান চাষীর অবস্থা একই। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাড়তি খরচে তার ধান উৎপাদন করেছেন। কিন্তু সেই ধানের বাজারে দাম নেই। ধান বিক্রি করে লাভ তো দুরের কথা মুলধন তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় কৃষকরা দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়ছেন। আগামী দিনে সংসার চালিয়ে অন্য চাষাবাদ কিভাবে করবেন তা ভেবে কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম জানান, ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি থেকে আশ্বিন জুড়ে অধিকাংশ জমির ধান মাড়াই শেষ হয়েছে। তবে ধানের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে কৃষি অফিসের কোনো হাত নেই। তিনি আরও জানান, ১৩০ দিনে উৎপাদনযোগ্য, জলবায়ুসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল ব্রি-৯৮ আউশের জাত আগাম হিসেবে ৬৫০ জন কৃষকের মাঝে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যাতে চাষিরা আগাম ধান ও আলু আবাদ করে লোকসান পুষিয়ে লাভবান হতে পারেন।
কৃ/স/জয়
Email : kshomoynews@gmail.com<br></br>
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ কৃষি সময়