
গাজীপুর সংবাদদাতাঃ
গাজীপুরের ফুসফুসখ্যাত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান নানা কারনে ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট রাইড, বন্ধ ক্যান্টিন, অকেজো টয়লেট, পানির সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অবৈধ দখলদারত্ব এবং জীববৈচিত্র্যের ধারাবাহিক অবক্ষয় ও অব্যবস্থাপনায় ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে জমজমাট ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান।
নানা সমস্যায় জর্জরিত এ উদ্যানের ব্যবস্থাপনার জন্য জনবল রয়েছে মাত্র ১৪ জন। ছয়টি প্রবেশগেট থাকলেও বর্তমানে চালু রাখা হয়েছে মাত্র একটি। উদ্যানের পেছনের বনখরিয়া, বনগ্রাম ও কুইচামারা এলাকার বড় অংশ খোলা। সেখানে কোনো বাউন্ডারি নেই। আশপাশের গ্রামের মানুষের চলাচলও রয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা উদ্যানের ভেতরের নির্জন এলাকায় চলে গেলে নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ে। উদ্যানে দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্টিন বন্ধ। পর্যাপ্ত খাবারের দোকানও নেই। বন রক্ষার স্বার্থে আগুন জ্বালিয়ে রান্না নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে কোনো পিকনিক পার্টিও আসছে না। শিশু পার্কের অধিকাংশ রাইড ভাঙা। লতাপাতা ও জঙ্গলে ঢেকে আছে বিভিন্ন স্থান। টয়লেট ও বিশ্রামাগারগুলোর অবস্থাও নাজুক। কোথাও দরজা-জানালা নেই, কোথাও পানি সরবরাহ না থাকায় সেগুলো বন্ধ।
লেকের সিঁড়িতে শ্যাওলা জমেছে, কোথাও সিঁড়ি ভেঙে গেছে। একসময় থাকা রিকশা, ভ্যান ও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থাও প্রায় বন্ধ। দর্শনার্থীরা জানান, নিরাপত্তার অভাবে উদ্যানের গভীরে যেতেও তারা ভয় পান।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ২২০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। তবে দখল, মানুষের চাপ ও পরিবেশগত নানা কারণে জীববৈচিত্র্য কমেছে। অতীতে এ এলাকায় বাঘ, চিতাবাঘ, হাতি, ময়ূর, মায়া হরিণ ও সাম্বার হরিণরে মতো প্রাণী দেখা যেত। তবে বনভূমির সংকোচন, অবৈধ স্থাপনা ও পরিবেশগত নানা কারণে প্রাণবৈচিত্র্য অনেকটাই কমেছে। বর্তমানে বানর, সাপ, বেজিসহ অল্প কিছু প্রাণীই চোখে পড়ে।
সারি সারি বৃক্ষের মাঝে পায়ে চলা পথ। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রামের জন্য ছিল বেঞ্চ কিংবা ছাউনি। বনের মাঝে কোথাও চোখে পড়ত পুকুর কিংবা ছোট আকারের লেক। তাই ইট-কাঠ ও যানজটের নগরী ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটাতে নব্বইয়ের দশকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ছুটে আসত মানুষ|
গাজীপুরের কোনাবাড়ী থেকে আসা দর্শনার্থী সোমা ইসলাম, রাখি ও তামান্না জানান, টয়লেট ব্যবহারের ব্যবস্থা না থাকায় তারা সমস্যায় পড়েছেন। শুধু পর্যটন নয়, বনটির পরিবেশগত গুরুত্বও রয়েছে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপক ড. আবিয়ার রহমান বলেন, ‘জাতীয় উদ্যান শুধু সংরক্ষিত এলাকা নয়, রাজস্ব আয়েরও সুযোগ। তবে রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।’ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে ইকোট্যুরিজম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, রিসোর্ট মালিক, শিক্ষার্থী ও জনপ্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
গাজীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম জানান, ‘দর্শনার্থী বাড়াতে পার্কের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে চেষ্টা চলছে। জনবল বৃদ্ধি, নিরাপত্তা, পানির সমস্যা সমাধান ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কৃ/স/জয়