
বরগুনা সংবাদদাতাঃ
বরগুনার তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি বনে গাছ চুরির হিড়িক পড়েছে। গত কয়েক দিনে এই বনের প্রায় হাজার খানেক গাছ কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রক্ষা করা এই বন এভাবে গাছ চুরি করায় পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষিত হয় এই অঞ্চলটি। ১৯৬৭ সালে নামকরণ করা হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল হিসেবে। ১৩ হাজার ৬৪৪ একর আয়তনের বিশাল এই বন এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিলো। এই বনের প্রধান গাছের মধ্যে রয়েছে- গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা ও গরান। এখানে বিচরণ করে কাঠবিড়ালি, বানর, সজারু, বুনো শূকর, কচ্ছপ, শিয়াল, বনমোরগ, ৪০ প্রজাতির সাপসহ বেশ কিছু প্রাণী।
গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে টেংরাগিরি বনাঞ্চল ও প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন নলবুনিয়া বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা শুরু করে দুর্বৃত্তরা। গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুই এলাকা থেকে প্রায় ৯০০ গাছ কাটা হয়েছে। এর মধ্যে টেংরাগিরি থেকেই কাটা হয় ৪০০ গাছ। শুভসন্ধ্যা এলাকা থেকে কাটা হয় প্রায় ৫০০ গাছ। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে রেইনট্রি, কেওড়া, গেওয়া, ঝাউ ও জিলাপি। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা এমনটি অভিযোগ করছেন।
এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্যমতে, দুর্বৃত্ত চক্রের সদস্যরা রাতের আঁধারে সাধারণত কাঠ পাচার করে। অনেক সময় গাছ কেটে বনের ভেতরে ফেলে রাখে। পরে সুবিধাজনক সময়ে সরিয়ে নেয়। এমনকি তারা চুরির প্রমাণ মুছে ফেলতে গাছের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত, বাবুল হাওলাদারসহ কয়েকজনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বৃত্তরা চুরি করে গাছ কেটে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই বন বিভাগের কর্মকর্তারা হুমকি দেন, তাদের বিরুদ্ধে গাছ কাটার মামলা দেবেন। এই ভয়ে তারা চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখলেও প্রতিবাদের সাহস পান না।
সোনাকাটা ইউপির চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চু এই বনের গাছ কাটার কথা স্বীকার করে অভিযোগ করেন,বন বিভাগের লোকজনের সখ্যাতা না থাকলে কেউ গাছ কাটতে পারে না।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান জানান, তারা তথ্য পেয়েছেন- চার দিনে টেংরাগিরি ও নলবুনিয়ার বন থেকে ৯ শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এই বনাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাতের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হয়ে মানুষকে রক্ষা করে। এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদে দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়বে। তাঁর ভাষ্য, বনের কাঁকড়া, গুইসাপ, বন্য শূকরসহ নানা প্রাণী শিকারের অভিযোগও পেয়েছেন।
বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, তারা অভিযোগ পাওয়ার পর সরেজমিন অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছেন। এ ঘটনায় মামলাও করেছেন।
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা অতীশ সরকার বলেন, টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বনের গাছ কাটার খবর পেয়ে পাঁচজনকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদের দেওয়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃ/স/জয়