
চাপাইনবাগঞ্জ সংবাদদাতাঃ
আমের মৌসুম শেষ। তবুও বাজারে মিলছে হরেক রকম আম। এই সময়ে এতো আম এর আগে আর দেখা জায়নি। চাষীদের কৌশলী চাষাবাদের কারনে লম্বা সময় ধরে এসব আম মিলছে বাজারে। অসময়ে বাজারে আাসয় এই আমের দামও অনেক চড়া। ফলে চাষীরা আম বিক্রি করে সিজনের চেয়ে কয়েকগুন বেশি লাভ করতে পারছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কানসাট আম বাজারে এখনো কমেনি ব্যস্ততা। মৌসুমি আমের সরবরাহ কমে এলেও আশ্বিনা, বারি-৪, বারি-৮, গৌড়মতি, খিরসাপাত কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোর মতো নাবি ও বারোমাসি জাতের আমে এখনো জমজমাট জেলার বৃহত্তম এই আম বাজার।
বৃহৎ এই আম বাজারে প্রতিদিনই হাজার হাজার মণ আম বেচাকেনা হচ্ছে। মৌসুমের শেষ সময়ে নাবি জাতের আমকে ঘিরে বাজারের এমন কর্মচাঞ্চল্য চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা।
বর্তমানে কানসাট বাজারে আশ্বিনা আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বারি-৪ ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, গৌড়মতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, কাটিমন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে মণ হিসেবে কিনলে দাম কিছুটা কম পড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের বাজারে সাধারণত প্রতিদিনই আমের দামের দরদাম ওঠানামা করে। বেশ কিছু দিন আগেও বাজারে আমের দামে ভাটা পড়েছিল। তবে এখন আমের শেষ সময়ের নাবি জাতের আমের কারণে কানসাটে সেই চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। নাবি জাতের আমের দাম ভালো থাকায় কৃষকেরাও সন্তুষ্ট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা এসব আম নিয়ে আসছেন কানসাট আম বাজারে। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে ব্যস্ত হয়ে উঠছে বাজারের আড়তগুলো।
এই কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যেই চাষিদের বড় একটি অংশের সামনে উঠে এসেছে আরও আকর্ষণীয় সম্ভাবনাÑঅসময়ে খিরসাপাত ( হিমসাগর) আমের উৎপাদন ও বাজার জাতকরণ।
মৌসুম শেষ হওয়ার পরও শিবগঞ্জের কয়েকটি বাগানে গাছে ঝুলছে জিআই স্বীকৃত খিরসাপাত বা হিমসাগর আম। সাধারণত মে-জুন মাসেই বাজারে আসে এ জাতের আম। অথচ পরীক্ষামূলকভাবে আগস্ট মাসে খিরসাপাত উৎপাদন করে দেখিয়েছেন কয়েকজন চাষি। অসময়ে উৎপাদিত এসব আম বিক্রি হচ্ছে মৌসুমের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে। কোথাও কোথাও বাগান থেকেই ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা।
বারি-৪ ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো নিয়ে বাজারে আসা চাষি আবদুস সালামের অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য, প্রতি মণ বারি-৪ আম প্রায় ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো প্রতি মণ ৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। চলতি মৌসুমের শেষে প্রত্যাশিত মূল্য পাওয়ায় চাষিরা সন্তুষ্ট।
কাটিমন আম নিয়ে বাজারে আসা চাষি আশরাফুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শেষ মুহূর্তে কাটিমন ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এ দাম সন্তোষজনক।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের মধ্যে খিরসাপাত বা হিমসাগরের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রয়েছে এ আমের চাহিদা। কিন্তু এ আমের মৌসুম সীমিত। সাধারণত মে মাসেই গাছে আসে খিরসাপাত। এবার সেই স্বাভাবিক সময়ের বাইরে আগস্টেও গাছে খিরসাপাত ধরিয়ে চমক দেখিয়েছেন শিবগঞ্জের কয়েকজন চাষি।
শিবগঞ্জের ভাঙাব্রিজ এলাকার আমচাষি সজিব আলীর বাগানেও কাটিমনের পাশাপাশি ঝুলছে খিরসাপাত আম। অসময়ে গাছে এই আম দেখে প্রথমে তিনিও বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে আম পরিপক্ব হওয়ার পর এর চাহিদা তৈরি হয়েছে। এমনকি বাগানে এসেই ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে আম কিনে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, খিরসাপাতের দেশি-বিদেশি চাহিদা থাকলেও মৌসুমের শুরুতে একসঙ্গে বিপুল আম বাজারে আসায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। অসময়ে খিরসাপাত উৎপাদনের বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এভাবে আম ধরানোর ঘটনা আগে তাঁদের জানা ছিল না। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কাজ করবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। মৌসুম শেষের দিকে এসেও নাবি জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
কৃ/স/জয়