
গাজীপুর সংবাদদাতাঃ
গাজীপুরের চাষীরা ‘ব্ল্যাক সুগারকেইন’ আখ চাষাবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। অন্য আখ চাষে যখন তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিলেন। ঠিক এ সময়ই কৃষি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এই ‘ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন’ বা ফিলিপাইনের কালো আখ।
গাজীপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গুড় উৎপাদনকারী ও চিবিয়ে খাওয়ার আখের চাষ হয়ে আসছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জেলা ইক্ষু আবাদের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে বর্তমানে মোট ১,৬০৩ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। উপজেলার হিসেবে সবচেয়ে বেশি আবাদ রয়েছে কাপাসিয়ায় ১,২২০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া শ্রীপুরে ১৮৯ হেক্টর, গাজীপুর সদরে ১০০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ৬০ হেক্টর ও কালিয়াকৈরে ৩৪ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হচ্ছে। জাতভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, জেলায় সবচেয়ে বেশি ৫৪২ হেক্টর জমিতে ঈশ্বরদী-১৬ জাতের আবাদ হচ্ছে।
পাশাপাশি চিবিয়ে খাওয়ার জনপ্রিয় জাত বিএসআরআই আখ ৪১ (অমৃত) ৩৮৪ হেক্টর, বিএসআরআই আখ ৪২ (রংবিলাস) ৩২৯ হেক্টর ও বিএসআরআই আখ ৪৭ ১৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। স্থানীয় ও প্রচলিত জাতের মধ্যে টেনাই (৮০ হেক্টর), স্থানীয় জাত (৩৮ হেক্টর), বিএসআরআই আখ ৪৬ (২৭ হেক্টর), চিমাইল (২২ হেক্টর), বিএসআরআই আখ ৩৭ (২০ হেক্টর) ও ঈশ্বরদী-৩৬ (১১ হেক্টর) জমিতে চাষ করা হচ্ছে।
প্রচলিত এসব জাতের ভিড়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিএসআরআই আখ ৪৯ (ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন’)। গাঢ় বেগুনি-কালচে রঙের ব্যতিক্রমী উপস্থিতি, অতি রসালো কাণ্ড ও চিবিয়ে খাওয়ার সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি কৃষকদের পাশাপাশি ভোক্তাদের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
কৃষির বৈচিত্র্যায়ন ও বেসরকারি খাতে গবেষণার অংশ হিসেবে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সাকাশ্বর মধ্যপাড়া এলাকায় বসুন্ধরা এগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বেসিল) গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ এই আখ চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মাঠ গবেষণায় দেখা গেছে, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে, কম খরচে এই আখের দ্বিগুণ ফলন লাভ করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় আখ চাষিদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটছে, অন্যদিকে দেশের বাণিজ্যিক ও চিবিয়ে খাওয়া আখের বাজারে সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
এ প্রকল্পটির মাঠ গবেষণার দায়িত্বে থাকা ফয়সাল আহমেদ জানান, রোপণের মাত্র আট মাসেই এই আখ গাছগুলো ১০ থেকে ১১ ফুট লম্বা হয়ে যায় এবং ১২ মাস পূর্ণ হলে এগুলোর উচ্চতা দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ ফুট। প্রতি ১০-১৪ দিন পর পর নিচের পুরোনো পাতা ভেঙে কেবল ৬-৮টি পাতা রাখা হলে আখ রোগবালাইমুক্ত থাকে ও দ্রুত বাড়ে। দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি অথবা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এই আখ রোপণের সেরা সময়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই আখের জমিতে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াই সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করা যায় এবং কীটনাশকের ব্যবহার একেবারেই কম লাগে।
বেসিলের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান এম. জেড. হোসেন আরজু বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই আখ চাষের পরিকল্পনা করছে। শুধু কাঁচা আখ হিসেবে বাজারে বিক্রি নয়, বরং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আখের তৈরি পানীয় (জুস), প্রিমিয়াম মানের গুড় ও বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে কাগজ শিল্পের কাঁচামাল তৈরির বৃহৎ রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত বোতলজাত জুস ও গুড় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই), গাজীপুর আঞ্চলিক অফিসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইনচার্জ ড. নিলুফার ইসলাম আখের জাতটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কৃষকরা যেটিকে ব্ল্যাক সুগারকেইন নামে চেনেন, সেটি মূলত বিএসআরআই উদ্ভাবিত ও অনুমোদিত ‘বিএসআরআই আখ ৪৯ জাত। বিএসআরআই আখ ৪৯ মূলত চিবিয়ে খাওয়া বা জুস বানানোর উপযোগী একটি জাত। এতে পানির পরিমাণ বেশি এবং সুগারের (চিনির) পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। এই জাতের সর্বোচ্চ গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ১৭১ টন পর্যন্ত হতে পারে।
কৃ/স/জয়