
ময়মনসিংহ সংবাদদাতাঃ
ময়মনসিংহের ভালুকায় বিভিন্ন শিল্প কারখানার অপরিশোধিত তরল ও রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি, কমছে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বিচরণ। কোথাও পানির রং বদলে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। একই সঙ্গে বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
ভালুকার বিভিন্ন এলাকার খাল,বিল,নদী-নালা,জলাশয়ের পানি রং কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত। এ উপজেলার শিল্প কারখানার থেকে নির্গত বর্জ্য নালা বা ড্রেনের মাধ্যমে আশপাশের জলাশয়ে ফেলার কারনে এমন অবস্থার সৃষ্টি। বৃষ্টি বা বর্ষাকালে কেমিক্যাল মিশ্রিত দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। যার কারনে কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পানি থেকে বের হচ্ছে গন্ধ। যা স্থানীয়দের জীবন বিষিয়ে তুলেছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, কারখানাগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন না করেই পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলায় ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পকারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৮৭২। এর মধ্যে ভালুকাতেই রয়েছে ৩৬৬টি।
শুধু ভালুকা নয়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া, গৌরীপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় শিল্পকারখানা বাড়ছে। শ্রমিক পাওয়া সহজ, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো এবং শিল্প স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ থাকায় এসব এলাকায় বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু শিল্পকারখানা স্থাপনের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও নজরদারি একই হারে বাড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করার অনুরোধ করে আসছেন। পরিবেশ দূষণ নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হয়নি।
ভালুকায় শিল্পকারখানার পাশাপাশি ব্যাটারি ও রাসায়নিকজাতীয় শিল্পের উপস্থিতিও পরিবেশের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। সিসা গলানোসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করে আশপাশের খাল-বিল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। দূষণের আরেকটি বড় উৎস শিল্পকারখানার ধোঁয়া।
কিছু কারখানার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া আশপাশের বাতাসকে দূষিত করছে। শিল্পবর্জ্যরে পাশাপাশি বায়ুদূষণও মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলন, ময়মনসিংহের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, ‘শিল্পবর্জ্যে খাল ও নদীর পানি দূষিত হওয়ার প্রভাব শুধু পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর। দূষিত পানি কৃষিজমিতে ব্যবহারের ফলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে দূষিত পানি ও সেই পানির মাছ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, শিল্পবর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন না করে পরিবেশে ছাড়া হলে দীর্ঘ মেয়াদে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। কারখানাগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মানছে কি না এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত অনুসরণ করছে কি না, তা তদারকিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক এনামুল হক জানান, গত এক দশকে জেলায় আবাদি জমি কমেছে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর। এর মধ্যে শিল্পায়নের প্রভাবে ভালুকায় মাত্র ছয় বছরেই কমেছে ১ হাজার ৪৩ হেক্টর কৃষিজমি। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যে খাল ও কৃষিজমি দূষিত হওয়ায় সেচের পানি, মাটির উর্বরতা ও উপকারী অণুজীব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃ/স/জয়