
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
সারা দেশে আমনের ভরা মৌসুমে সার নিয়ে কৃষকদের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে। সরকার বলছে সারা দেশের ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। কিন্তু কৃষকরা ডিলারদের কাছে গিয়ে চাহিদা মাফিক সার পাচ্ছেন না। তাদের বলা হচ্ছে মজুদ নেই। বাধ্য হয়ে কৃষকরা ফসল রক্ষায় বাড়তি দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে। এমনিতেই এবার বেশি দামে ডিজেল,কিটনাশক,শ্রমিক দিয়ে চাষাবাদ করতে হচ্ছে। ফলে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। আবাদ শেষে এই খরচ হাতে ফিরে পাওয়া নিয়ে এখন থেকৈই শঙ্কা তৈরি হয়েছে চাষীদের মনে।
কৃষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি বছরে অতিবৃষ্টির কারণে সিলেটে বোরো ধানের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে বৃষ্টি ও বন্যায় নষ্ট হয়েছে ৪৩টি জেলার আউশ আবাদ। বোরো ও আউশের এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একমাত্র উপায় ছিল আমন আবাদ। কিন্তু সারের অভাবে আমনের ফলন ব্যাহত হওয়ার পথে। এমনটি হলে দেশব্যাপী তীব্র খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যথাসময়ে সার আমদানির অনুমোদন না দেওয়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে সরবরাহের এই ঘাটতি।
ইতোমধ্যে দেশের ৭টি সরকারি সার কারখানার মধ্যে ৬টিরই গ্যাস, জ্বালানি ও কাঁচামালের চরম সংকটের কারণে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। সারের উৎপাদন ও আমদানি সংকটের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে অসাধুু ব্যবসায়ীরা ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম নিচ্ছে। যা নিয়ে কৃষকদের মনে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে আমনে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০ কেজির বস্তায় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা জানান, ইউরিয়ায় ২৫০, টিএসপিতে ৩৫০, ডিএপিতে ৩৫০ এবং এমওপিতে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। এতে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আ. জা. মু. আহসান শহীদ সরকার বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমিতে আমন চারা রোপণ হয়েছে।
জয়পুরহাটের কালাইয়ে সার সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। ১ বস্তা টিএসপি কিনতে হচ্ছে ১৮০০ টাকায়। এতে কৃষকদের বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না। দোকানে গেলে ডিলার বলেন টিএসপি-ডিএপি সার নেই। আবার প্রতি বস্তায় ৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিলে সার পাওয়া যায়।
কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনুর রশীদ বলেন, সারের সংকট নিরসনে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিক্রয়কেন্দ্র ও গোডাউনে যৌথ অভিযান চালাচ্ছে।
নওগাঁয় চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে। এরই মধ্যে রোপণ শেষ হয়েছে ৮০ ভাগ জমির। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া সার ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ১৩৫০ টাকা, টিএসপি ১৩৫০, ডিএপি ১০৫০ ও এমওপি সার ১০০০ টাকায় বিক্রির কথা। কিন্তু বাজারে বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, জেলায় সারের কোনো ক্রাইসিস নেই। ডিলাররা অতিরিক্ত দাম নিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহীতে জেলাজুড়ে সারা নিয়ে চরছে চরম নৈরাজ্য। কৃষকরা সরকার নির্ধারিত দামে সারা পাচ্ছেন না। কারসাজি করে এ জেলায় বেশি দামে সারা বিক্রি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে যা দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সারের মোট চাহিদা ৫৮ লাখ ৫০০ টন। তার মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ ২০ হাজার টন। নন-ইউরিয়া সার যেমন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ১৪ লাখ ৮৫ হাজার। ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ৭ লাখ ৫০ হাজার ও মিউরেট অব পটাশের (এমওপি) ৯ লাখ ৫০ হাজার টন। এসবের মধ্যে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের ভান্ডারে মজুদ রয়েছে ইউরিয়া ৫ লাখ ১৭ হাজার ৯০০ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪০ হাজার ৯০০ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, মৌসুম বোরো, আমন ও আউশÑ এই তিন ফসলে কী পরিমাণ সারের দরকার হবেÑ সেটি নির্ধারণ করে থাকে। সে হিসাবে আমনে মোট ১৮ লাখ ৬ হাজার ৭৪৬ টন সার দরকার হয়। ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ৮ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৫ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮০০ টন। ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৪ টন টিএসপির বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯০০ টন, ৪ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৩ ডিএপির বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩০০ টন, ৩ লাখ ৩৩৮৪ টন এমওপির বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার টন। এসব হিসাবে দেখা গেছে টিএসপি ছাড়া বাকি সব ধরনের সারে চাহিদার চেয়ে মজুদ ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে দেশে ৭টি সার কারখানার মধ্যে সচল রয়েছে শুধু ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি (জিপি) সার কারখানা। বন্ধ রয়েছে বাকি ৬টিই। এগুলো হলোÑ চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল), যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল), আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি (এএফসিএল), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) ও শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি (এসএফসিএল)।
রাজশাহী ও রংপুরে সফরকালে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কৃষকদের সারপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি এবং ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। কৃষক যাতে হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় সার পেতে পারেন, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে হবে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মজুদও বেশি। সারের কৃত্রিম সংকটের কথা বলে যারা বিভ্রান্তি তৈরি করছে, তা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
কৃ/স/জয়