
কৃষি সময় ডেস্কঃ
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রতিদিন এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকরা সৈকতজুড়ে ফেলছে নানা ধরনের প্লাস্টিকের বোতল-বাটি, চা-কফির কাপ, খাবারের প্যাকেট, পলিথিনের ব্যাগসহ হাজারো বিষাক্ত বর্জ্য। যেগুলো জোয়ারের পানিতে ভেসে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। যা একটু একটু করে ধ্বংস কররে দিচ্ছে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশকে।
জানা যায়,কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি থেকে প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয় অন্তত ৬০ কেজি খালি পানির বোতল। ৫ হাজারের বেশি ওয়ানটাইম চায়ের কাপ। মাস্ক এবং এক ট্রাকের বেশি চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট, ডাবের খোসা ও পলিথিন।
গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কখনো হারিয়ে যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপ, লবণাক্ত পানি ও ঢেউয়ের আঘাতে এগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। তৈরি হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক ও আরও ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিকে। এগুলো তখন আর খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু সমুদ্রের পানিতে তলদেশে থেকে যায়। সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ, ডলফিন, তিমি, কাঁকড়া, ঝিনুক, সামুদ্রিক পাখিসহ অসংখ্য প্রাণী খাবার ভেবে এসব প্লাস্টিক গিলে ফেলে। আর এই প্রাণীগুলো যখন মানুষের খাবারে পরিণত হয় তখন তা মানুষের শরীরকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিভিন্ন গবেষণায় ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যান্সার, হৃদরোগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বন্ধ্যত্ব, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে সমস্যা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং স্নায়বিক জটিলতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, উপকূল ক্ষয় হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক দূষণ। প্লাস্টিক উৎপাদন, পরিবহন ও পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে সৈকতে জমে থাকা প্লাস্টিক উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
প্লাস্টিকের কারণে মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। ড্রেন ও জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্লাস্টিক পোড়ালে ডাইঅঙ্নিসহ বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। যা শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রবাল, শৈবাল ও সামুদ্রিক উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। মাছের প্রজনন কমে যায় এবং পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ায় পর্যটন শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়ে। যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, সৈকতে পর্যটকরা যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলছে। এগুলো পঁচে না। মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিনত হয়। এগুলোতে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশ্রিত থাকে। সেগুলো চলে যাচ্ছে সমুদ্রের মাছের পেটে। এতে করে ইকো-সিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে, রোগ-বালাই সৃষ্টি হচ্ছে। প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহার ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় দেশে হয়তো শিগগিরই একটি ভয়াবহ অশনি সংকেত আমাদের সামনে দেখা যাবে।
তিনি আরো বলেন,পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার, সঠিক ব্যাবস্থাপনার অভ্যাস তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় আইন বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় এগুলো যেমন মাটি-পানি-বায়ু দূষিত করবে, জলজ-স্থলজ প্রাণীর ক্ষতি করবে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে, তেমনি এটি আমাদের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সৈকতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান ও ভলান্টিয়াররাও নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্থানে স্থানে ডাক্টবিন বসিয়েছি। সচেতনতামূলক মাইকিং করছি। যদি পর্যটকরা আরও সচেতন হোন তাহলে আমাদের এই সমুদ্র ও সমুদ্র সৈকতকে সুন্দর রাখাটা আরও সহজ হবে। তাছাড়া, স্থানীয় দোকানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেনো প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যবহার না করে।
কৃ/স/জয়